তন্ময় দেবনাথ বিভাগীয় প্রধান রাজশাহীঃ
রাজশাহী মহানগরীর অপরাধ ও মাদকের অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত মতিহার থানা এলাকা। এই অঞ্চলের মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে বহুমুখী অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা মাসুদ রানা রাব্বানীকে ঘিরে এবার পুলিশের তথ্যভাণ্ডার ‘সিডিএমএস’ (ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) থেকে মামলার রেকর্ড উধাও হওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একসময়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী কীভাবে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সাংবাদিকতার মতো পেশাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অপরাধ সাম্রাজ্য বিস্তার করলেন এবং কার ইশারায় কেন্দ্রীয় পুলিশি ডাটাবেজ থেকে তার যাবতীয় অপরাধের নথি মুছে ফেলা হলো, তা নিয়ে রাজশাহীজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই নেপথ্য শক্তিকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বরাবর লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদরদপ্তরে পাঠানো অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, মতিহার থানাধীন তালাইমারী কাজলা এলাকার বাসিন্দা মাসুদ রানা রাব্বানীর বিরুদ্ধে অতীতে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, রাষ্ট্রদ্রোহ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার দায়ে ডজনেরও বেশি মামলা ও জিডি ছিল। বিএনপি সরকারের আমল থেকেই তিনি মতিহার অঞ্চলের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার ও কারাবরণের নথিসহ ২০২১ সাল পর্যন্ত তার নামে থাকা এসব মামলার বিস্তারিত বিবরণ পুলিশের সিডিএমএসে সংরক্ষিত ছিল। তবে সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, পুলিশি তথ্যভাণ্ডার থেকে তার অতীত অপরাধসংক্রান্ত অধিকাংশ তথ্য ও সন্ত্রাসী তালিকার রেকর্ড রহস্যজনকভাবে মুছে ফেলা হয়েছে। এটি কোনো কারিগরি বা সার্ভার জটিলতা, নাকি কোনো প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে অপরাধীকে দায়মুক্ত করার অপচেষ্টা—তা নিয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত নথিতে ২০২১ সালের একটি নিয়মিত মামলাসহ রাব্বানীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া পুরোনো একাধিক মামলার প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ কেন্দ্রীয় সিস্টেমে এসব তথ্যের অনুপস্থিতি পুলিশের অভ্যন্তরীণ ডেটা নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পুলিশ প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন রাব্বানী। প্রায় পাঁচ-ছয় বছর আগে মতিহার এলাকার এক মাদককারবারিকে পুলিশের মাধ্যমে আটক করিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে রাব্বানীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী মিজানুর রহমান টনির সঙ্গে পুলিশের অর্থ লেনদেনের কথোপকথন শোনা যায়। এছাড়া ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আরএমপি বোয়ালিয়া মডেল থানায় দায়ের করা একটি রাজনৈতিক মামলায় প্রতিপক্ষ সাংবাদিক ও ভিন্নমতের ব্যক্তিদের নাম ঢুকিয়ে দিয়ে পরে তা বাদ দেওয়ার নামে অর্থ দাবির অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে একই বছরের ২৮ নভেম্বর দায়ের হওয়া আরেকটি রাজনৈতিক মামলায় বাদীকে চাপ প্রয়োগ করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এজাহার করানোর অভিযোগ পাওয়া যায়। মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা তৎকালীন ডিবি কর্মকর্তা এসআই মিজানের সঙ্গে রাব্বানীর যোগসাজশে মামলার নাম অন্তর্ভুক্তি ও অব্যাহতির নামে বিপুল অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ তোলেন খোদ বাদী, যার ভিডিও বক্তব্য সংরক্ষিত রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাব্বানী রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থেকে বিরোধী মতের নেতাকর্মীদের পুলিশের মাধ্যমে গ্রেপ্তার করিয়ে নিয়মিত বাণিজ্য চালিয়েছেন। ২০২৩ সালের রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তৎকালীন মেয়রের পক্ষে প্রচারণায় তার সক্রিয় অংশগ্রহণের ভিডিও চিত্রও প্রকাশ্যে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে নিজের অতীত অপকর্ম, মামলা এবং পুলিশের সঙ্গে অস্বচ্ছ যোগাযোগের বিষয়গুলো জনসমক্ষে আসতে শুরু করলে তিনি রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী প্রেসক্লাব ও পেশাদার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংঘবদ্ধ অপপ্রচার ও চরিত্র হননে লিপ্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে রাজশাহী প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঐতিহ্যবাহী প্রেসক্লাবকে বিতর্কিত করার লক্ষ্যে একটি স্বার্থান্বেষী চক্র মাঠে নেমেছে। তারা বিভিন্ন ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে মূলধারার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ও অপপ্রচার চালাচ্ছে। এসব ফেক আইডি শনাক্ত করতে ইতোমধ্যে পুলিশ প্রশাসনকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। নেপথ্যে কারা রয়েছে তা সাংবাদিক সমাজের জানা এবং তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ এখন শুধুই সময়ের ব্যাপার।
পুলিশের কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার থেকে মামলার রেকর্ড অপসারণের বিষয়ে রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি) মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির জানান, মাঠপর্যায় থেকে সাধারণত সিডিএমএসে মামলার তথ্য সংযোজন করা যায়, তবে তথ্য মুছে ফেলার বা রিমুভ করার কোনো সুযোগ স্থানীয়ভাবে নেই। মাসুদ রানা রাব্বানীর সিডিএমএস রেকর্ড সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইজিপির নির্দেশনার আলোকে তদন্ত শেষে সত্যতা মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
একজন চিহ্নিত অপরাধী কীভাবে সাংবাদিকতার পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দায়মুক্তি পেয়ে আসছেন এবং রাষ্ট্রীয় স্পর্শকাতর তথ্যভাণ্ডার থেকে তথ্য গায়েব করার দুঃসাহস দেখালেন, সেই প্রশ্ন এখন রাজশাহীর সচেতন মহলে। জনস্বার্থেই এই অপরাধচক্রের পাশাপাশি নেপথ্যে থেকে পুলিশি ডাটাবেজ কারসাজিতে সহায়তাকারী অসাধু কর্মকর্তাদের অবিলম্বে মুখোশ উন্মোচন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে।
https://www.kaabait.com