নন্দীগ্রাম (বগুড়া) প্রতিনিধিঃ বগুড়ার নন্দীগ্রামে দীর্ঘদিন বৃষ্টির দেখা নেই। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানিতে সজীব থাকার কথা যে আমন ধানের মাঠের, সেখানে দেখা দিয়েছে পানির তীব্র সংকট। অনাবৃষ্টিতে জমির মাটি শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে, কোথাও কোথাও ফেটে চৌচির। পানির অভাবে ধানের চারা নুয়ে পড়ছে, কোনো কোনো জমিতে চারার পাতা হলুদ বর্ণ ধারণ করছে। এমন পরিস্থিতিতে আমন ধান বাঁচাতে সেচের পানির জন্য দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। কিন্তু প্রয়োজনের সময় অনেক গভীর নলকূপ চালু না থাকায় সেচের পানি পাওয়া নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
কৃষকদের অভিযোগ, চুরির আশঙ্কায় অনেক গভীর নলকূপের মালিক বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার খুলে নিরাপদ স্থানে রেখে দিয়েছেন। ফলে জমিতে সেচের প্রয়োজন দেখা দিলেও কিছু এলাকায় দ্রুত পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে, বিদ্যুতের ঘনঘন লোডশেডিং ও ট্রান্সফরমার ওঠানো-নামানোর অতিরিক্ত খরচ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
উপজেলার চাকলমা, রিধইল, কাথমসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা বলছেন, সময়মতো বৃষ্টি না হলে এবং জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব না হলে আমন ধানের ফলন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হবে। বিশেষ করে ধানের গোছা বৃদ্ধি ও শীষ বের হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পানির ঘাটতি দেখা দেওয়ায় ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, চাকলমা মাঠের প্রায় ৮০ বিঘা এবং রিধইল মাঠের প্রায় ৩০০ বিঘা জমিসহ বিভিন্ন এলাকার আমনক্ষেতে পানির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। জমির উপরিভাগ শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে। অনেক স্থানে মাটিতে ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও পানির অভাবে ধানের চারা নুয়ে পড়েছে এবং হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে।
সাধারণত আমন মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করেই এ অঞ্চলের অধিকাংশ কৃষক চাষাবাদ করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় এবার অনেক কৃষককে বিকল্প হিসেবে সেচের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে উৎপাদন খরচ, অন্যদিকে প্রয়োজনমতো পানি না পাওয়ায় ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কৃষকদের মতে, আমন ধানের এ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জমিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বৃষ্টির অভাবে জমি শুকিয়ে যাওয়ায় ধানের গাছের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত বৃষ্টি না হলে কিংবা বিকল্প সেচের ব্যবস্থা করা না গেলে অনেক কৃষককে লোকসানের মুখে পড়তে হতে পারে।
অনাবৃষ্টির মধ্যে সেচের পানির চাহিদা বাড়লেও গভীর নলকূপের ট্রান্সফরমার নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। চুরির আশঙ্কায় অনেক নলকূপ মালিক ট্রান্সফরমার খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখছেন। এতে প্রয়োজনের সময় সেচযন্ত্র চালু করা নিয়ে জটিলতা দেখা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
কৃষকদের অভিযোগ, ট্রান্সফরমার স্থাপন করা থাকলেও সব সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আবার ট্রান্সফরমার খুলে রাখার পর পুনরায় স্থাপন করতে অতিরিক্ত অর্থ ও সময় ব্যয় হচ্ছে। ফলে একদিকে কৃষকেরা জমিতে পানি পাচ্ছেন না, অন্যদিকে সেচযন্ত্রের মালিকেরাও খরচ ও লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন।
নলকূপ মালিকদের আশঙ্কা, আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে কিংবা বিদ্যুৎ সরবরাহে বারবার বিঘ্ন ঘটলে ট্রান্সফরমার ওঠানো-নামানোর খরচ আরও বাড়বে। এ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সেচ কার্যক্রম সচল রাখার মধ্যে সমন্বয় করা তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে নন্দীগ্রাম উপজেলায় প্রায় ১৯ হাজার ৫৪৫ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। এসব জমিতে সেচের পানি সরবরাহের জন্য উপজেলায় রয়েছে ৩৫৩টি গভীর নলকূপ।
বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দিলে এসব সেচযন্ত্রের ওপর কৃষকদের নির্ভরতা বেড়ে যায়। কিন্তু প্রয়োজনের সময় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হলে বিপুল পরিমাণ আবাদি জমিতে ধানের পরিচর্যা নিয়ে সমস্যা দেখা দিতে পারে। ফলে আমন ধানের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত সেচের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন কৃষকেরা।
রিধইল গ্রামের কৃষক জয়নাল হোসেন বলেন, “বৃষ্টি না থাকায় সেচ দিয়ে ধান বাঁচানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু প্রয়োজনমতো পানি পাচ্ছি না। নলকূপ মালিকেরা পাম্প চালু না করায় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। জমিতে ঠিকমতো সেচ দিতে না পারলে এবার আমনের ভালো ফলন পাওয়া কঠিন হবে।”
তিনি বলেন, ধানের গাছ বাঁচিয়ে রাখতে এখন জমিতে পানির প্রয়োজন। সময়মতো সেচ দিতে না পারলে ধানের বৃদ্ধি ব্যাহত হবে এবং উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কাথম গ্রামের কৃষক মাহাতাব বলেন, “আমরা সাধারণত বর্ষার পানির ওপর নির্ভর করেই আমন ধান চাষ করি। ভাদ্র মাসে ধানের গোছা বাড়ানোর সময়। অথচ এ সময় জমিতে পানির অভাবে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে ধান নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়বে।”
তিনি আরও বলেন, ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনমতো পানি পাওয়া জরুরি। বৃষ্টি না হলে সেচের বিকল্প ব্যবস্থা সচল রাখা প্রয়োজন।
চাকলমা গ্রামের কৃষক জামিল উদ্দিন বলেন, “ইতোমধ্যে ধানের শীষ বের হতে শুরু করেছে। কিন্তু আকাশে বৃষ্টি নেই। তীব্র গরমের মধ্যে জমিতে সেচও দেওয়া যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দ্রুত জমিতে পানি দিতে না পারলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।”
কৃষকদের আশঙ্কা, ধানের গুরুত্বপূর্ণ বৃদ্ধি পর্যায়ে পানির সংকট অব্যাহত থাকলে ফলনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তাই বৃষ্টির অপেক্ষায় বসে না থেকে সেচের পানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।
গভীর নলকূপের মালিক বাবলু বলেন, “চুরির ভয়ে ট্রান্সফরমার নামিয়ে রেখেছি। কিছুদিন আগে চোরেরা নলকূপ মেশিনের তার চুরি করে নিয়ে গেছে। এখন বৃষ্টি না থাকায় সেচের প্রয়োজন হচ্ছে। কিন্তু বারবার ট্রান্সফরমার ওঠানো-নামানোর খরচ বহন করা কঠিন। তার ওপর রয়েছে লোডশেডিং। সব মিলিয়ে ট্রান্সফরমার স্থাপন করেও লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।
আব্দুর রউফ উজ্জল
নন্দীগ্রাম বগুড়া
তারিখ :১৫-১০-২০২৬
01712499468